যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে ইরানের সঙ্গে নতুন সমঝোতায় উপসাগরীয় দেশগুলো! মধ্যপ্রাচ্যে বদলে যাচ্ছে ক্ষমতার সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দ্রুত বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার পথ খুঁজছে বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান-ওমান, ওমান-কাতার, ইরান-সৌদি আরব এবং কাতার-সৌদি আরবের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জানা গেছে, এসব বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা, সহাবস্থান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা। বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি কেবল শুরু। আগামী মাসগুলোতে আরও বৈঠকের মাধ্যমে নতুন কূটনৈতিক সমঝোতার রূপরেখা চূড়ান্ত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন সমীকরণ
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালীর নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং সম্ভাব্য আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উপসাগরীয় দেশ ও ইরানের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা চলছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে ইরানকে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে, তাও আলোচনায় এসেছে। যদিও একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেও পৃথকভাবে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং আগস্টের শেষ নাগাদ একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমছে
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক গনুল তোলের মতে, গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন মনে করছে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে সরাসরি বোঝাপড়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প।
তার ভাষায়, ভবিষ্যতে এসব দেশ ওয়াশিংটনের বাইরে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী পৃথক নিরাপত্তা সমঝোতায়ও পৌঁছাতে পারে।
প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই অবস্থান
যদিও কূটনৈতিক পর্যায়ে নতুন উদ্যোগ চলছে, প্রকাশ্যে এখনো উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকেই সমর্থন করছে।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক আঞ্চলিক বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীতে অবাধ, শর্তহীন ও বাধাহীন নৌচলাচলের ওপর জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কোনো ধরনের টোল, অতিরিক্ত ফি বা একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা হয়।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি বলেন, হরমুজ প্রণালীতে নতুন টোল বা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ‘লাল রেখা’।
হরমুজকে নতুন কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে দেখছে ইরান
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সহজে হরমুজ প্রণালীর ওপর তার কৌশলগত প্রভাব ছাড়তে রাজি নয়। বরং সরাসরি টোলের পরিবর্তে মাইন অপসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা কিংবা বীমার মতো সেবার বিপরীতে ফি আদায়ের পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে ইরান নবগঠিত ‘গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’র মাধ্যমে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য ইরানি বীমা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান অন্তর্বর্তী সময় শেষ হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হতে পারে বড় হাতিয়ার
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের কারণে চাপে থাকা ইরানের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিনিময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমানো এবং নিরাপত্তা হুমকি হ্রাসের বিষয়ে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে পারে।
নিরাপত্তায় ‘প্ল্যান-বি’ ও ‘প্ল্যান-সি’
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে চায় না। তারা বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে।
তাদের নতুন কৌশল হলো—যুক্তরাষ্ট্র থাকলে ভালো, তবে না থাকলেও যেন নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। সেই লক্ষ্যেই তারা ইরানের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক সমঝোতা এবং বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ